নজরুল ইসলাম হক্কানী::
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শান্তির কথা বলা সহজ, কিন্তু যুদ্ধ থামানো কঠিন। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান বিশ্বরাজনীতির দ্বৈত বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ যুদ্ধ ও সংকটের মধ্যেও অস্ত্র ও জ্বালানির ব্যবসায় যুক্ত কিছু গোষ্ঠীর জন্য তৈরি হচ্ছে মুনাফার সুযোগ। মানুষের দুর্ভোগ যদি কারও ব্যবসার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তবে সেই বিশ্বব্যবস্থার মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। ১ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক মনে করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্থক হয়নি। একই জরিপে ৭১ শতাংশ নাগরিক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রা¤েপর ইরাননীতি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই জনমত উপেক্ষা করা তার প্রশাসনের জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, কিন্তু এর আর্থিক বোঝা বহন করেন সাধারণ করদাতারা। যুদ্ধ মানে শুধু বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের প্রাণহানি, জনপদ ধ্বংস, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের সংকট। যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, এমন দেশগুলোর মানুষও এর অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হন। শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে বাড়তি ব্যয় বহন করা সবচেয়ে কঠিন। বিপরীতে, অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য সংঘাত নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই যুদ্ধের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের পাশাপাশি এর মানবিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ। ১২ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের কাছাকাছি ওঠার কথা বলা হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন ও শিল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের উত্তাপ পৌঁছে যায় বিশ্বের দূরবর্তী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের ঘরেও। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী যুক্তরাষ্ট্রই এখন জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানোর প্রয়োজনে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ১৩ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ উদ্যোগ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের দুই দলের আইনপ্রণেতাদের আপত্তি রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে রাশিয়া অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে এবং ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিমা ঐক্য দুর্বল হতে পারে। আমদানি বাড়ালেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা রক্ষার নীতি অনুসরণ করছে। তবে ইউরোপকেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ সামলাতে হচ্ছে। এতে স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও বড় ভূমিকা রাখে। তবে অর্থনৈতিক চাপের অজুহাতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা কিংবা আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি কেবল শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের হিসাবেই চলবে? পৃথিবীর স¤পদ, প্রযুক্তি ও উৎপাদনক্ষমতা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। অথচ অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বাজার দখল এবং স¤পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই মানবিক প্রয়োজনকে পেছনে ঠেলে দেয়। সাম্যভিত্তিক বিশ্ব গড়ার অর্থ সব দেশের স¤পদ সমান করে দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বজায় রেখে শুধু যুদ্ধ না থাকাকে শান্তি বলা যায় না। এই পরিবর্তনে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন, যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে চীন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের পরিবর্তে অন্য কোনো শক্তির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাও সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন ও সব রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা অনেক সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। গাজা, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। নিরাপত্তা পরিষদের জবাবদিহি বাড়ানো, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং আগ্রাসন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্বৈতনীতি পরিহার জরুরি। কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী বলেই আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় শুধু বড় শক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করলেও চলবে না। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সম্মিলিত অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও শান্তিকামী মানুষের আন্দোলনকে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদের পাশাপাশি অস্ত্র ব্যবসায় স্বচ্ছতা, সামরিক ব্যয়ের জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর দাবিও তুলতে হবে। সামরিক ব্যয়ের পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু মোকাবিলা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানোই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের জন্যও এই সংকটের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমাদের আমদানি ব্যয়, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব পড়ে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, চাপে পড়ে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবার। তাই জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি ও কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং অপচয় কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার ও দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। কোনো পরাশক্তির অবস্থান অন্ধভাবে অনুসরণ না করে জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে গুরুত্ব দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার সঙ্গে স¤পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সবশেষে, পৃথিবীকে যুদ্ধের বাজার থেকে মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবীতে রূপান্তর করতে হলে অস্ত্র ও জ্বালানির বাজারে জবাবদিহি, একচেটিয়া আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রনায়কদের সাফল্য শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, যুদ্ধের ঝুঁকি কতটা কমল এবং মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত। বিশ্বের মানুষ যুদ্ধ নয়, নিরাপদ জীবন, সাশ্রয়ী খাদ্য ও জ্বালানি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়। অস্ত্র ও জ্বালানির বাজারে কিছু গোষ্ঠীর মুনাফা বাড়বে, আর কোটি কোটি মানুষ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার বোঝা বইবে- এমন পৃথিবী কাম্য হতে পারে না। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, কার্যকর বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতি এবং মানুষের সম্মিলিত দাবি। পৃথিবীর স¤পদ মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হবে, ধ্বংসের বাজার সম্প্রসারণে নয়- এই উপলব্ধিই হোক আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতির ভিত্তি।
[নজরুল ইসলাম হক্কানী : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে বিশ্ব, মুনাফায় কারা
- আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৮:২৮:০০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৮:২৮:৩৩ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক